এনসিপির প্রথম দফা ও গণমুখী রাষ্ট্রের প্রশ্ন
শেখ সাদ্দাম হোসাইন
এনসিপির ২৪ দফা বেশ সুচিন্তিতভাবে লেখা হয়েছে—পড়ে মনে হলো। নিশ্চয়ই জ্ঞানী ও গুণীজনরা এই ২৪ দফায় কন্ট্রিবিউট করেছেন। তবু প্রতিটি দফা নিয়েই হয়তো কিছু বলবার কথা রয়ে গেছে। যেমন, দফা ১ নিয়ে আমার মনে হলো কিছু কথা বলা যেতে পারে।
প্রথম প্রশ্ন, এনসিপির নতুন সংবিধান ও সেকেন্ড রিপাবলিক আসলে কার রিপাবলিক?
জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রথম দফা পড়লে একথা মানতেই হয়—এটি ইতিহাসে দাঁড়িয়ে কথা বলে এবং জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রূপ দেওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। “নতুন সংবিধান”, “গণপরিষদ”, “সেকেন্ড রিপাবলিক”—এই শব্দগুলো নিঃসন্দেহে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতির শক্তিশালী প্রতীক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সেকেন্ড রিপাবলিক কি জনগণের ক্ষমতার রাষ্ট্র, নাকি কেবল শাসনব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস? এটি যাচাই করতে আমি লক্ষ্য করবো—এনসিপি কি গণমুখী রাজনীতি করতে চায়, না বাজারমুখী—সেদিকে।
দফা ১–এ বারবার বলা হয়েছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার—কিন্তু লক্ষণীয়ভাবে অনুপস্থিত একটি বিষয়: অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের স্পষ্ট অঙ্গীকার।
গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান মানেই যদি হয় শুধু—ক্ষমতার তিন বিভাগের ভারসাম্য, একনায়কতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্রের বিলোপ—তাহলে এটি মূলত লিবারাল কনস্টিটিউশনাল রিফর্ম, গণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণ নয়।
একটি সত্যিকারের গণমুখী সংবিধানে প্রশ্ন ওঠে:
উৎপাদনের ওপর জনগণের অধিকার কী হবে?
রাষ্ট্র কি কেবল রেফারি, নাকি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সক্রিয় পক্ষ?
বাজার কি সংবিধানের ঊর্ধ্বে থাকবে, নাকি সংবিধানের অধীন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দফা ১–এ নেই।
দুই নম্বর প্রশ্ন, এনসিপির ২৪ দফা কোন দর্শনে দাঁড়ানো: লিবারাল ডেমোক্রেসি বনাম সোশ্যাল ডেমোক্রেসি
প্রথম দফার ভাষা মূলত লিবারাল ডেমোক্রেটিক: ব্যক্তির অধিকার, ক্ষমতার বিভাজন, ইনক্লুসিভনেস, ফ্যাসিবাদবিরোধিতা—এসব জরুরি, কিন্তু অপর্যাপ্ত।
সোশ্যাল ডেমোক্রেসি হলে এখানে থাকতে হতো: সংবিধানিকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা, অর্থনৈতিক বৈষম্যকে রাষ্ট্রীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিতকরণ, পুঁজির রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা।
জার্মান সংবিধানে “social state”, ভারতীয় সংবিধানে “Directive Principles”, লাতিন আমেরিকার বহু সংবিধানে “economic justice”—এসবের মতো কোনো স্পষ্ট সমাজ-অর্থনৈতিক দর্শন এখানে নেই।
ফলে আশঙ্কা থেকে যায়—সেকেন্ড রিপাবলিক রাজনৈতিকভাবে নতুন, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে পুরনো থেকে যেতে পারে।
তৃতীয় প্রশ্ন, মজলুম বনাম জালেম: কার বিরুদ্ধে এই সংবিধান?
দফা ১–এ বলা হয়েছে—একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ। কিন্তু করপোরেট–রাষ্ট্র আঁতাতে, অলিগার্কদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়, মিডিয়া ও আমলাতন্ত্রের শ্রেণিগত পক্ষপাতিত্বে কি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ সম্ভব?
নতুন সংবিধান যদি শুধু ক্ষমতার রূপ বদলায়, কিন্তু ক্ষমতার শ্রেণি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে মজলুমের মুক্তি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
ইতিহাস বলে—
“সংবিধান বদলালেই সমাজ বদলায় না, যদি ক্ষমতার মালিক না বদলায়।”
দফা ১ এনসিপির নৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে, কিন্তু অর্থনৈতিক ও শ্রেণিগত অবস্থানকে অস্পষ্ট রাখে। এটি ফ্যাসিবাদবিরোধী, কিন্তু এখনও পুরোপুরি গণমুখী নয়। এটি লিবারাল ডেমোক্রেসির দরজা খোলে, কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেসির প্রতিশ্রুতি দেয় না।
সেকেন্ড রিপাবলিক যদি সত্যিই মজলুমের রিপাবলিক হয়, তাহলে সংবিধান হতে হবে শুধু শাসনের আইন নয়, শোষণের বিরুদ্ধে দলিল।
লেখক : চিন্তক ও এক্টিভিস্ট। নিয়মিত লেখালেখি করে থাকেন। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ডেনমার্ক থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।



