রাজনীতির আয়নাবাজি
মোঃ রাকিব উদ্দিন
১৯ নভেম্বর, ২০২৫ টিবিএস রিপোর্টে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী জামায়াত অফিসিয়ালি বিবৃতি দিয়ে চট্টগ্রামের নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরদের কাছে দেওয়ার বিপক্ষে বলেছেন।
লিঙ্কঃ https://www.tbsnews.net/bangla/bangladesh/news-details-416156
টিবিএস রিপোর্টে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী আমরা জানতে পারি—
“চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সাবেক আমির মুহাম্মদ শাহজাহান বিবৃতিতে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। আবার দেশের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুও চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে সম্পৃক্ত। তাই চট্টগ্রাম বন্দর বিষয়ে তাড়াহুড়ো প্রবণ, অস্বচ্ছ ও গোপন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাই করতে চাচ্ছে। কোনো দরপত্র ছাড়াই পতিত স্বৈরাচারের আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পৃক্ত এক বিদেশি কোম্পানিকে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) তুলে দেওয়ার যাবতীয় ষড়যন্ত্র চলমান।’
বিবৃতিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এছাড়াও অন্যান্য কয়েকটি টার্মিনালের বিষয়েও সরকারের বর্তমান সিদ্ধান্তে জনগণের মাঝে ক্ষোভ ও ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।’
তবে আবার ঐকমত্য কমিশনে জামায়াতের হয়ে সংস্কার নিয়ে কাজ করা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির ২৫শে নভেম্বর তার ফেইসবুক পোষ্টে এর সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলেছেন—
“চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন বাধা দিচ্ছেন কেন? বন্দরের কর্মক্ষমতা বাড়লে আপনাদের সমস্যা কী? সংস্কারে বাধা প্রদান কিসের ইঙ্গিত? সেই পুরনো পদ্ধতিতেই থাকতে চান? আর কবে পরিবর্তন হবেন?”
সাধারণত এই রকমটি আপনি বিএনপির মধ্যে দেখবেন। দলের দুইজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলছেন। যাতে দুটি বিপরীতমুখি আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ভারসাম্য করা যায়। কিন্তু জামায়াতের মধ্যে এই কালচার কখনো দেখা যায় না। কিন্তু এখন কেন এমন হচ্ছে?
এমনকি হতে পারে, জামায়াতের দলগতভাবে পুরাতন এস্টাবলিশমেন্টের সাথে হাত মিলিয়েছে। তবে তরুণ প্রজন্মের কাছে যেন এই মেসেজ না যায় যে জামায়াত সংস্কারের বিপক্ষে—সেজন্য শিশির মনিরকে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলাচ্ছেন।
কিছুদিন আগে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের আগে একটা ঘটনা লক্ষ করি। ১৭ অক্টোবর ৪টা ২৫ মিনিটে প্রধান উপদেষ্টা সভাপতিত্বে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হয়। সেখানে এনসিপি ছাড়া বাকি সব দল বিশেষভাবে বললে বিএনপি জামায়াত স্বাক্ষর করে। এনসিপি স্বাক্ষর করে না—কারণ জুলাই সনদে জুলাই সনদের বাস্তবায়নে আইনি ভিত্তি ছিল না। এনসিপি যা বলেছে তাই করেছে। শত চাপ উপেক্ষা করেও নিজেদের কথার ওপর অটল থেকেছে।
কিন্তু ১৬ অক্টোবর ২০২৫ যুগান্তরে প্রকাশিত এক সংবাদে আমরা জানতে পারি—
“জাতীয় সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের জন্য জুলাই সনদে আগামী নভেম্বরে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা না হলে সনদে স্বাক্ষর করবে না বলে জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বৃহস্পতিবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ‘জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি, গণভোট ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।”
লিঙ্কঃ https://www.jugantor.com/politics/1016747
যেহেতু জুলাই সনদে জামায়াতের দাবি অনুযায়ী উভয় কক্ষে পিআর এবং নভেম্বরে গণভোট আয়োজনের কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না, তাই ধরে নেয়া যাচ্ছিলো জামায়াত জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে না। কিন্তু ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সবাইকে চমকে দিয়ে জামায়াত অংশগ্রহণ করে। ফলত এনসিপি স্বাক্ষর না করার দলে একা হয়ে পড়ে।
জামায়াতের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বিএনপির নেতা-কর্মীরা জামায়াতের রাজনীতিকে গুপ্ত রাজনীতি বা মোনাফেকির রাজনীতি বলে অভিহিত করে। বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতের নেতা-কর্মীদের দুর্নীতির অভিযোগ তুলনামূলক কম, কিন্তু তাদের ভুল বা দেশের স্বার্থবিরোধী রাজনীতি নেহায়েতই কম নয়। বিএনপির নেতা-কর্মীরা জামায়াতের যে রাজনীতিকে গুপ্ত রাজনীতি বা মোনাফেকির রাজনীতি বলে তাকেই জামায়াত বলে হেকমতের রাজনীতি বা বিচক্ষণতার রাজনীতি। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বাংলাদেশের আরও বেশি অগ্রযাত্রা না হওয়ার পেছনে ভুল রাজনীতি নাকি দুর্নীতি—কোন ব্যাপারটা বেশি অবদান রেখেছে তা বিশদ গবেষণার দাবি রাখে।
লেখক : ব্যবসায়ী, ইউএসএ প্রবাসী।



